অধ্যায় ১৪ : তাবুক যুদ্ধ-কাব রা: এর ঘটনা ও দ্বীনি প্রশিক্ষণ

তাবুক যুদ্ধ
রোম সাম্রাজ্যের সথে সংঘর্ষ

তখন আরব দেশের উত্তরে ছিলো বিশাল রোম সাম্রাজ্য। মক্কা বিজয়ের আগে থেকেই এই সাম্রাজ্যের সাথে মুসলমানদের সংঘর্ষ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। নবী করীম (স) সিরিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী গোত্রসমূহের নিকট ইসলামের দাওয়াত নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছিলেন। এই গোত্রগুলোর অধিকাংশই ছিলো খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এবং রোম সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন। এই গোত্রগুলোর অধিকাংশই ছিলো খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এবং রোম সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন। তারা মুসলিম প্রতিনিধি দলের পনেরো ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেললো। শুধু প্রতিনিধি দলের নেতা কা’ব বিন উমর গিফারী প্রাণ নিয়ে ফিলে এলেন। ঐ সময় হযরত (স) বসরার গভর্নর শেরজিলের নামেও ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে এক পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু উক্ত গভর্নরও রোম সাম্রাজ্যের অধীনস্ত বলে হযরত (স)-এর প্রতিনিধি হযরত হারিস বিন আমীরকে হত্যা করলো।

এই সব কারণে সিরিয়ার সীমান্ত এলাকাবর্তী মুসলমানদেরকে একেবারে দুর্বল ভেবে কেউ যাতে উত্যক্ত করতে সাহসী না হয়, সে জন্যে হযরত (স) অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল মাসে তিন হাজার মুসলমানের এক বাহিনী প্রেরণ করলেন। এই বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়েই শেরজিল প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে মুকাবিলার জন্যে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু মুসলমানরা এ সংবাদ জানতে পেরেও সামনে এগুতে লাগলো। রোম সম্রাট তখন হাম্‌স নামক স্থানে অবস্থান করছিলো। কিন্তু মুসলমানরা তা সত্ত্বেও যথারীতি অগ্রসর হতে লাগলো। অবশেষে ‘মুতা’ নামক স্থানে এই পদক্ষেপের ফলে বিপুল সংখ্যক রোমক সৈন্যের মুকাবিলায় এই নগণ্য সংখ্যক মুসলিম সৈন্যের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু আল্লাহর ফযলে রোমকদের এতোবড়ো বাহিনীও মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করতে পারলো না; বরং তারাই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। এই ঘটনায় আশপাশের সমগ্র গোত্রের ওপর মুসলমানদের মোটামুটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। এর ফলে দূর-দূরান্ত এলাকার গোত্রসমূহ পর্যন্ত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো এবং হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করলো।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হলো এই যে, ফারওয়া বিন আমর আল -জাজামী নামক রোমক বাহিনীর একজন অধিনায়ক ইসলামের শিক্ষায় আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। এই ব্যক্তি তাঁর ঈমানদারীর কি বিরাট প্রমাণ দিয়েছিলেন, তাও লক্ষ্য করবার মতো। তাঁকে বন্দী করে দরবারে এনে রোম সম্রাট কাইসার বললো :

‘ইসলাম ত্যাগ করে আপন পদে পুনর্বহাল হও, নতুবা মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।’

জবাবে তিনি পদমর্যাদার ওপর পদাঘাত হেনে বললেন : ‘আখিরতের সাফল্যের বিনিময়ে দুনিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত নই।’ অবশেষে তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। এই ঘটনার ফলে হাজার হাজার লোক ইসলামের নৈতিক শক্তি এবং তার যথার্থ গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলো। তারা বুঝতে পারলো যে, প্রবল সয়লাবের ন্যাগ অগ্রসরমান এই আন্দোলনের মুকাবিলা করা কোনো চাট্টিখানি কথা নয়।

কাইসারের পক্ষ থেকে হামলার প্রস্তুতি

পর বছরই রোম সম্রাট কাইসার মুসলমানদের কাছ থেকে মুতা’ যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে সিরীয় সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি শুরু করে দিলো এবং তার অধীনস্থ আরব গোত্রসমূহের নিকট থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলো। এ প্রস্তুতির কথা নবী করীম (স) যথাযময়ে জানতে পারলেন। এ মুহূর্তটি ছিলো মুসলমানদের পক্ষে অত্যন্ত সংকটজনক। এ সময়ে সামান্য মাত্র গাফলতি দেখালেও সমস্ত কাজ বানচাল হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো। একদিকে মক্কা অভিযান ও হুনাইন যুদ্ধে পরাজিত আরব গোত্রগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতো, অন্যদিকে শত্রু পক্ষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী মদীনার মুনাফিকরাও ঠিক মাহেন্দ্রক্ষণে ইসলামী সমাজের মধ্যে ভয়ঙ্কর ফাসাদ সৃষ্টি করে দিতো। তার ফলে যুগপৎ আন্দোলন ও সংগঠনকে সামলানোই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তো। এমনি সময়ে রোমক শক্তির সর্বাত্নক হামলার মুকাবিলা করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিলো না। এমন কি, এই বিরাট হামলা মুকাবিলা করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিলো না। এমন কি, এই বিরাট হামলার মুকাবিলা করতে না পেরে কুফরের কাছে ইসলামী আন্দোলনের পরাজিত হবার আশংকা পর্যন্ত ছিলো। এ সমস্ত কারণেই হযরত (স) তাঁর খোদা-প্রদত্ত অতুলনীয় দূরদৃষ্টির বলে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন যে, এ সময় কাইসার বাহিনীর মুকাবিলা করাই সমীচীন। কারণ এ সময় আমাদের সামান্য মাত্র দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও এতদিনের গড়া সমস্ত কাজ বানচাল হয়ে যেতে পারে।

মুকাবিলা করার সিদ্ধান্ত

কিন্তু এ সময় মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছিলো এক কঠিন পরীক্ষার শামিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষাবস্থা, তদুপরি প্রচণ্ড গ্রীষ্মকাল। ক্ষেতের ফসল পাকতে প্রায় শুরু করেছিলো। যুদ্ধের সামান-পত্রও পুরো ছিলো না। সফর ছিলো দীর্ঘ পথের । সর্বোপরি মুকাবিলা ছিলো এক বিশাল বাহিনীর সঙ্গে। এতদসত্ত্বেও নবী করীম (স) পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে যুদ্ধের কথা ঘোষণা করলেন এবং কোথায় কি উদ্দেশ্যে যেতে হবে, তাও সুস্পষ্টভাবে বলে দিলেন।

প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে, এতদিন ইসলামী আন্দোলন শুধু খোলাখুলিভাবে বহিঃশত্রুর সঙ্গেই মুকাবিলা করে আসছিলো। আর মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধের পর বিরুদ্ধবাদীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছিলো। কিন্তু এ যাবত ঘরোয়া শত্রু অর্থাৎ মুনাফিকদের সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমাসুলভ আচরণই করা হচ্ছিলো। এর একটি কারণ ছিলো এই যে, একই সঙ্গে ঘরের ও বাইরের শত্রুদের সাথে সমানে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্যে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতা এতদিন ইসলামী আন্দোলন হাসিল করতে পারেনি। দ্বিতীয় কারণ এই যে, মুনাফিকদের মধ্যে সবাই একই ধরনের লোক ছিলো না। তাদের মধ্যে কিছু লোকের হৃদয়ে হয় ঈমানের দুর্বলতা ছিলো, নতুবা কিছু কিছু ক্ষেতে তারা শোবা-সন্দেহ পোষণ করতো। এই ধরণের লোকদের আপন দুর্বলতা ও শোবা-সন্দেহ থেকে মুক্ত হবার জন্যে একটা যুক্তিসঙ্গত সময় পর্যন্ত সুযোগ দেবার প্রয়োজন ছিলো।

অন্যদিকে ইসলামের মূলোচ্ছেদ করার জন্যে মুসলমানদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এমন সব দুশমনদেরকেও ভালমতো চিহ্নিত করে নেয়া একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো। তাই এতদিন পর্যন্ত এই সব লোককে নরম - গরম সকল প্রকারেই বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে যাদের ভেতর সামান্য মাত্রও যোগ্যতা ছিলো, তারা সোজা পথে চলে এলো। কিন্তু এক্ষণে সে সুযোগটিও শেষ হয়ে গেলো। মুসলমানরা দেশের ভেতরকার বিরুদ্ধবাদীদের বহুলাংশে প্রভাবাধীন করে নিয়েছেন। এবার বিদেশী শক্তির সঙ্গে তাদের মুকাবিলা শুরু হতে যাচ্ছে। এমনি নাজুক অবস্থার কারণেরই ঘরোয়া শত্রুদের মাথা গুড়িয়ে দেবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো। নচেত এরা বাইরে শত্রুদের সঙ্গে যোগ সাজশে কখন কি ক্ষতি করে বসে, কে জানে!

মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন

মুনাফিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে কয়েকটি জিনিসের একান্ত প্রয়োজন ছিলো। যেমনঃ তাদের খোলাখুলিভাবে সামনে আসা, তাদের চেহারা থেকে ঈমান ও ইসলামের মুখোশ অপসারিত হওয়া, তাদের আসল পরিচয়টা গোটা ইসলামী সমাজের জেনে নেয়া, সর্বোপরি মুসলমানদের ব্যাপারে মুসলমান হিসেবে তাদের নাক গলানো এবং ইসলামী সমাজ সংগঠনে সাচ্চা মুসলমানদের ন্যায় মর্যাদা লাভের সুযোগ না থাকা। তাই তাবুক যুদ্ধের এই ঘোষণা মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচনে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হলো। যারা ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী ছিলো, এ সময়ে তারা মনে-প্রাণে জিহাদের জন্যে তৈরি হয়ে গেলো। তারা অর্থ-কড়ি র প্রয়োজন হওয়ামাত্র যার কাছে যা ছিলো, সবই এনে হাযির করলো। এমন কি সওয়ারীর অভাবে হযরত (স)-এর সহযাত্রী হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় কিছু লোক কেঁদে ফেললো। এভাবে এসলামী সমাজ সংগঠনে কে কে নিষ্ঠাবান ছিলো, তা সুস্পষ্টভাবে জানা গেলো।

পক্ষান্তরে যাদের হৃদয়ে ঈমানের নাম-নিশানা ছিলো না, যুদ্ধের ঘোষণা শুনেই যেনো তাদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। তারা নানারূপ বাহানা ও অজুহাত তালাশ করতে লাগলো এবং যুদ্ধে যাবার জন্যে হযরত (স)-এর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো। এ সময়ও হযরত (স) তাদের সঙ্গে নম্র ব্যবহারই করলেন এবং এদের সবাইকে যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দিলেন। কিন্তু এই মুনাফিকদের দল শুধু নিজেরাই যুদ্ধ হতে বিরত থেকে ক্ষান্ত হলো না; বরং এরা অন্যান্য লোকদেরও বিরত রাখার এবং নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করতে লাগলো।

এরা কখনো বলতে লাগলো, ‘এতো প্রচণ্ড গরমে যুদ্ধে গিয়ে কি তোমরা প্রাণ হারাবে?’ আবার কখনো বললো : ‘এতো হচ্ছে জেনে-শুনে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা।’ মোটকথা যুদ্ধের ঘোষণা এমন এক কষ্টিপাথরের কাজ করলো যে, সাচ্চা মুমিন আর মুনাফিকদের চেহারা স্পষ্টত পৃথক হয়ে গেলো। এর ফলে এই শ্রেণীর লোকদের বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের মোক্ষম সুযোগ পাওয়া গেলো। এ ব্যাপারে হযরত (স) তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তা যথাস্থানে আলোচিত হবে।

তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা

অবশেষে নবম হিজরীর রজব মাসে হযরত (স) ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা হতে যাত্রা করলেন; এর মধ্যে মাত্র দশ হাজার ছিলো অশ্বারোহী। উটের সংখ্যা এতো কম ছিলো যে, একটি উটের পিঠে পালাক্রমে কয়েকজন করে সৈন্য সওয়ার হতে লাগলো। এরপর ছিলো গ্রীষ্মের প্রচন্ডতা এবং পানির অভাব। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সাচ্চা মুমিনগণ এ সময় তাদের ঈমানের পরাকাষ্ঠা, নবীর আনুগত্য এবং আল্লাহর পথে আত্নোৎসর্গের যে আগ্রহ প্রদর্শন করলো, আল্লাহ তা মঞ্জুর করলেন এবং এর বিনিময়ে তিনি এমন ব্যবস্থা করে দিলেন যে মদীনা থেকে নবী করীম (স)-এর রওয়ানা করার উদ্দেশ্য বিনা যুদ্ধেই হাসিল হয়ে গেলো। নবী করীম (স) তাবুক পৌঁছেই জানতে পারলেন যে, রোম সম্রাট কাইসার সীমান্ত থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে; তাই যুদ্ধ করার মত সেখানে আর কেউ বর্তমান নেই।

ব্যাপারটা ঘটেছিলো এই রকম : রোম সম্রাট যখন জানতে পারলো যে, তার এতবড়ো জবরদস্ত প্রস্তুতির খবর পেয়েও মুসলমানরা নিঃশংক চিত্তে তাদের মুকাবিলার জন্যে মদীনা থেকে যাত্রা করেছে এবং ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়ে আসছে, তখন সে নিজের সৈন্য সরিয়ে নেয়াই সমীচীন মনে করলো। কারণ এর আগে মুতা’ যুদ্ধের সময় এক লাখ সৈন্যের মুকাবিলায় মাত্র তিন হাজার মুসলমান কিরূপ শৌর্য-বীর্য দেখিয়েছিলো, সে অভিজ্ঞতা সম্রাটের মন থেকে মুছে যায়নি। না জানি এবারও পরাজিত হয়ে তার মান-ইজ্জতটুকু একেবারে খতম হয়ে যায়! তাই যখন সে জানতে পারলো, এবার তিন হাজার নয়, ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে নবী করীম (স) আসছেন, তখন সে এ সয়লাবের মুকাবিলা না করারই সিদ্ধান্ত করলো।

তাবুকে অবস্থান

কাইসারের এভাবে ময়দান থেকে পশ্চাদপসারণ করাকেই নবী করীম (স) যথেষ্ট মনে করলেন। এরপর তার পশ্চাদ্ধাবনে কালক্ষেপণ করার চেয়ে তিনি ঐ এলাকায় নিজের প্রভাবকে মজবুত করাকে সমীচীন মনে করলেন। তিনি বিশ দিন সেখানে অবস্থান করলেন। এ সময়ে রোম সাম্রাজ্য ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এবং রোমকদের প্রভাবাধীন কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যকে তিনি নবীন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে নিলেন। এভাবে যে সব আরব গোত্র এতদিন রোম সম্রাটের সমর্থক ছিলো, তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সমর্থক ও সাহায্যকারী বনে গেলো।

মুনাফিকদের চালবাজি

হযরত (স) যখন তাবুক অভিযানে রওয়ানা করলেন, তখন ইসলামী সমাজ-সংগঠনে অনুপ্রবেশকারী কপট মুসলমানরা মদীনায় পড়ে রইলো। তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিলো, মুসলমানরা এ অভিযান থেকে আর নিরাপদে ফিরে আসবে না। তাদের কিছু অংশ গ্রীষ্মের প্রচন্ডতা ও সফরকালীন মুসিবতে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তা না হলেও কাইসারের বিপুল সৈন্যেরা মুকাবিলায় তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই মুনাফিকদের দল মদীনায় একটি চক্রান্তের মসজিদও৫২ বানিয়ে নিয়েছিলো। সেখানে তারা নামাযের বাহানায় সাধারণ মুসলমানদের থেকে আলাদাভাবে জমায়েত হতো এবং গোপন সলা-পরামর্শ করতো। তারা এই সংকটকালে ইসলামী আন্দোলনের ওপর চরম আঘাত হানবার জন্যে নানারূপ ষড়যন্ত্র উদ্ভাবন করতে লাগলো। এমন কি, তারা এই সিদ্ধান্ত পর্যন্ত করে বসলো যে, তাবুক যুদ্ধের ফলাফল জানবার পরই (যদিও এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিলো যে, মুসলমানদের পরাজয়ই হবে যুদ্ধের একমাত্র ফলাফল) আব্দুল্লাহ বিন্‌ উবাইকে মদীনার বাদশাহ নিযুক্ত করা হবে।

কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার অভিপ্রায় ছিলো অন্য রকম। এবার ইসলামের পরাজয় সম্পর্কে মুনাফিক ও কাফিরদের সমস্ত আশা-ভরসাই চূড়ান্তভাবে বিলীন হওয়ার সেই প্রতীক্ষিত সময়টি ঘনিয়ে এলো। তাই তাবুকের এই বিনা -যুদ্ধে বিজয়ের কথা জানতে পেরে দুশমনদের মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙে পড়লো। তাদের মনে হতে লাগলো, এবার তাদের আশা - ভরসার শেষ সম্বলটুকুও হাতছাড়া হয়ে গেলো। তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হযরত (স)-এর সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো :

১. মুনাফিকদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ এবং তাদের গোপন চক্রান্ত থেকে ইসলামী আন্দোলনকে সুরক্ষিত করার পরোপুরি ব্যবস্থা করা;
২. মুমিন ও সত্যসন্ধ লোকদের প্রশিক্ষণ দান এবং তাদের চরিত্র গঠন করে নবী করীম (স)-এর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠা সৎ লোকদের এই দলটিকে সর্বতোভাবে নিখুঁত করে তোলা এবং ‘সত্যের সাক্ষ্য’ (শাহাদাতে হক) দানের যে দায়িত্ব শীগগীরই তাদের ওপর ন্যস্ত হতে যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে পালনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে প্রস্তুত করে রাখা;
৩. যে সব মৌল নীতির ভিত্তিতে এই নয়া ইসলামী রাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে হবে, দারুল ইসলামের সেই সব নীতি সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করা।

মুনাফিকদের সাথে আচরণ

তাবুক থেকে হযরত (স)-এর মদীনায় প্রত্যাবর্তন কালে পথিমধ্যেই সূরা তাওবা নাযিল হলো। এতে মদীনায় ফিরেই হযরত (স)--কে কার্যকর করতে হবে, আল্লাহ তাঁকে এমনতরো কতিপয় নির্দেশ প্রদান করলেন। এ যাবত মুনাফিকদের ব্যাপারে জন বাঁচানোর জন্যে পেশকৃত অক্ষমতাকে মেনে নেয়া হয়েছিলো, তা সম্পূর্ণ বদলে ফেলার নির্দেশ দেয়া হলো। তারপর সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয় হলো : ‘তাদের সঙ্গে এখন আর নমনীয় নয়, কঠোর ব্যবহার করতে হবে; তারা তাদের ঈমানের দাবিকে সত্য প্রমাণের জন্যে আর্থিক সাহায্য দিতে চাইলে তা গ্রহণ করা যাবে না; তাদের ভেতরকার কেউ মারা গেলে নবী করীম (স) তার জানাযা পড়াতে পারবেন না; সর্বোপরি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণেও মুসলমানরা তাদের সঙ্গে আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারবে না।’

আবু আমেরের ষড়যন্ত্র

হযরত (স)-এর মদীনা আগমনের পূর্বে আবু আমের নামক জনৈক খ্রিষ্টান পাদ্রীর দরবেশী ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে মদীনায় খুব খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। একজন খোদাভক্ত জ্ঞানী হিসেবে লোকেরা তাকে খুব শ্রদ্ধা করতো। হযরত (স)-এর মদীনায় আসার পর এই দরবেশী ও খোদাভক্তির তাগিদেই তার উচিত ছিলো সত্যের আলো থেকে ফায়দা হাসিল করা এবং সবার আগে খোদা-ভক্তির নির্ভুল ধারণাকেক গ্রহণ করা। কিন্তু ইলম, কালাম ও তাকওয়ার অহমিকা এবং রেওয়াজী ও গতানুগতিক ধার্মিকতার মোহ যেমন মানুষকে সত্যের আলো গ্রহণ থেকে বিরত রাখে, তেমনি আবু আমেরের ওপরও ইসলামী দাওয়াতের প্রতিকূল প্রভাব পড়লো। ধার্মিকতার ব্যবসায়ে তার বিবেক-বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলো। সে বুঝতে পারলো, তার ভণ্ড দরবেশী ও পীরবাদী ব্যবসা এই নয়া আন্দোলনের মুকাবিলায় টিকতে পারে না। এ কারণে সে ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো দুশমন হয়ে দাঁড়ালো।

প্রথমত সে আশা করেছিলো যে, এ-তো কেবল দুদিনের চমক মাত্র। এরূপ কঠোর খোদাভক্তি ও দ্বীনদারী কি করে টিকে থাকে? কিন্তু বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় দেখেই তার টনক নড়ে উঠলো। তারপর থেকে সে কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রকে ইসলামে বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার জন্যে আদা-পানি খেয়ে লাগলো। ওহুদের যুদ্ধ ও খন্দকের (আহযাবের) হামলার সময় মুসলমানদের সামনে এরই কিছু নমুনা প্রকাশ পেয়েছিলো। এমন কি, এই ঈসায়ী আহলি কিতাব মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাথে গোপন আঁতাত স্থাপন করতে এবং তওহীদের আলোকবর্তিকাকে নিভানোর জন্যে শিরকের প্রচার করতে এতটুকু লজ্জাবোধ করেনি। কিন্তু আল্লাহর এই ঘোষণা যখন প্রকাশ পেল যে, এ আলোকবর্তিতকাকে ফুৎকার দ্বারা নিভানো যাবে না এবং ইসলামই তামাম আরব উপদ্বীপে বিজয়ী দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তখন এই খোদাভক্ত দরবেশের (?) অস্থিরতা চরমে গিয়ে পৌঁছল। এপর অল্প দিনের মধ্যেই সে বিদেশে গিয়ে বিপদ - সংকেত বাজানো এবং এই ক্রমবর্ধমান সয়লাবকে প্রতিরোধ করার নিমিত্তে কাইসারকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে রোম সফরে গেলো।

চক্রান্তের মসজিদ

আবু আমেরের এই সব চক্রান্তে মদীনার মুনাফিকরা তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলো। এরা আমেরের সাথে মিলে গোপনে পরামর্শ করে ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার পন্থা উদ্ভাবন করতো। তাই আবু আমেরের পরামর্শক্রমে মুনাফিকের দল নিজেদের জন্যে একটি পৃথক মসজিদ বানানোর সিদ্ধান্ত করলো।৫৩ ঐ মসজিদে তারা নামায পড়ার অজুহাতে জমায়েত হতো এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাতো।

তখন মদীনায় দু’টি মসজিদ ছিলো। এর একটি ছিলো শহরের উপকন্ঠে - কুবা নামক স্থানে আর অপরটি ছিলো শহরের মাঝখানে - মসজিদে নববী নামে যা পরিচিত। এ দুয়ের উপস্থিতিতে কোন তৃতীয় মসজিদের আদতেই প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু কতিপয় বৃদ্ধ ও অক্ষম লোকের ঐ দুই মসজিদে যেতে কষ্ট হয়, এই অজুহাত তুলে মুনাফিকরা একটি তৃতীয় মসজিদ নির্মাণ করলো। তারা কল্যাণ ও বরকতের সাথে এর উদ্বোধন করার নিমিত্ত এতে একবার নামায পড়ানোর জন্যে হযরত (স)-এর কাছে আবেদন জানালো। সে আবেদনের জবাবে হযরত (স) বললেনঃ ‘বর্তমানে আমি তাবুক অভিযানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত; ফিরে আসার পর দেখা যাবে।’ কিন্তু ফিরবার সময় পথিমধ্যেই এই চক্রান্তের মসজিদে হযরত (স)-এর নামায পড়ানো নিষিদ্ধ করে আল্লাহ তা’আলা ওহী নাযিল করলেন। এতে স্পষ্টত বলে দেয়া হলো যে, প্রকৃতপক্ষে এ জায়গাটি হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার একটি গোপন আড্ডা; এ আপনর নামায পড়ানোর উপযোগী নয়। তাই হযরত (স) কতিপয় লোককে তাঁর মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই উক্ত মসজিদ ধ্বংস করে ফেলার আদেশ দিলেন। এভাবে উক্ত চক্রান্তের মসজিদ ধ্বংস করে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভবিষ্যত কর্মনীতিই ঘোষণা করা হলো। এরপর থেকে হযরত (স) এই কর্মনীতিই সর্বত্র অনুসরণ করলেন।

মুমিনদের প্রশিক্ষণ ও তার পূর্ণতা

এখান থেকে ইসলামী আন্দোলন একটি ব্যাপকতর সংগ্রামের পর্যায়ে প্রবেশ করলো। এবার আরবের এই মুষ্টিমেয় মুসলমানদের গোটা অমুসলিম দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীনের পয়গাম ছড়িয়ে দেয়ার অভিযানে বর্হিগত হবার সময় ঘনিয়ে এলো। এহেন অবস্থায় মুসলিমদের ভেতরকার কোনো মামুলি দুর্বলতাও বিরাট অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই, এ সময় মুমিনদের প্রশিক্ষণের পূর্ণতা বিধানের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগ দেয়া হলো। তাদের ঈমানী দুর্বলাতার প্রতিটি আলামতকে বেছে বেছে চিহ্নিত করা হলো এবং অবিলম্বে তা দূর করার তাগিদ দেয়া হলো।

তাবুক অভিযান কালে ঈমান ও ইসলামের মিথ্যা দাবিদার কিছু লোক যেমন পেছনে পড়েছিলো, তেমনি কিছু দুর্বল-চেতা মুমিনও মদীনায় থেকে গিয়েছিলো। এরা সাচ্চা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কোনো সাময়িক দুর্বলতা বা শৈথিল্যের কারণে এমনি গাফলতি করতে বাধ্য হয়েছিলো। এরূপ দুর্বলতা যাতে আর কখনো প্রকাশ না পায়, সে জন্যে এই শ্রেণীর লোদের সংশোধন করার নিমিত্তে এ সময় অত্যন্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করা হলো। এ প্রসঙ্গে হযরত কা’ব বিন্‌ মালিক, হিলাল বিন্‌ উমাইয়া এবং মুরারা বিন্‌ রাবী (রা) এই তিনজন সাহাবীর কাহিনী অত্যন্ত শিক্ষামূলক। তখন মুসলিমদেরকে কি ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছিলো, এই কাহিনীর আলোকে তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে আন্দাজ করা যায়। এই সাহাবীত্রয় নিঃসন্দেহে সাচ্চা মুমিন ছিলেন এবং এর আগে তাঁদের ঈমানের আন্তরিকতাও প্রমাণিত হয়েছিলো; তবু নিছক শৈথিল্যের দরুন তাঁরা তাবুক অভিযানের সময় হযরত (স)-এর সহযাত্রী হতে পারেন নি। এ জন্যে তাঁদেরকে অত্যন্ত কঠোরভাবে পাকড়াও করা হলো। নবী করীম (স) তাবুক থেকে ফিরে এসে তাঁদের সঙ্গে কোনোরূপ সালাম-কালাম না করার জন্যে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিলেন। চল্লিশ দিন পর তাঁদের স্ত্রীদেরকেও আলাদা থাকবার নির্দেশ দেয়া হলো। অতঃপর পঞ্চাশ দিন পর আল্লাহ তা’আলা তাঁদের তওবা কবুল করলেন এবং তাঁদেরকে ক্ষমা করবার হুকুম দিলেন। এর ভিতর হযরত কা’ব বিন্‌ মালিকের কাহিনীটি সর্বাধিক শিক্ষামূলক বিধায় তাঁর জবানীতেই এখানে উদ্ধৃত করা হলো।

হযরত কা'বের কাহিনী

‘হযরত (স) যখন তাবুক অভিযানের উদ্দেশ্যে মুসলমানদেরকে তৈরি করছিলেন, তখন আমিও তাঁর সঙ্গে চলার জন্যে প্রস্তুতি নেয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু তারপর গাফলতি করতে লাগলামঃ ‘এতো তাড়াহুড়া কেন, সময় যখন আসবে তখন তৈরি হতে বিলম্ব হবে না।’ এইভাবে ব্যাপারটা পিছিয়ে যেতে লাগলো। এমন কি যখন রওয়ানা করার সময় এলো, তখন আমি সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলাম। মনে মনে বললাম : সৈন্যরা চলে যাক, আমি দু একদিন পর রওয়ান করেও কাফেলার সঙ্গে গিয়ে মিলিত হতে পারবো। মোটকথা, এমনি গাফলতির মধ্যেই সময় চলে গেলো; আমি ও আর যেতে পারলাম না।

অবশেষে যখন দেখতে পেলাম যে, যাদের সঙ্গে আমি পিছনে পড়ে রয়েছি, তারা হয় মুনাফিক নতুবা এমন দুর্বল যে, আল্লাহই তাদের অক্ষম করে রেখেছেন, তখন আমার হৃদয় অপরিসীম চাঞ্চল্যে উথলে উঠলো। নিজের সম্পর্কে আমার অত্যন্ত আফসোস হলো।

নবী করীম (স) অভিযান থেকে ফিরে এসেই অভ্যাস মতো মসজিদে গিয়ে দু রা‘আত নামায পড়লেন। অতঃপর লোকদের সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্যে বসলেন। এবার মুনাফিকরা এসে তাদের ওজর পেশ করতে লাগলো। তারা কসম করে তাদের অক্ষমতা সম্পর্কে হযরত (স)-কে নিশ্চয়তা প্রদান করতে লাগলো। এরূপ লোকের সংখ্যা আশির চেয়ে কিছু বেশি ছিলো। হযরত (স) তাদের সমস্ত মনগড়া কথা শুনলেন এবং তাদের প্রকাশ্য ওজর কবুল করে তার গোপন রহস্য খোদার ওপর ছেড়ে দিলেন। এভাবে তাদেরকে মাফ করে দেয়া হলো।

এরপর এলো আমার পালা। আমি সামনে গিয়ে সালাম নিবেদন করলাম। হযরত (স) আমার দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ‘বলো কি জিনিস তোমায় বিরত রেখেছিলো?’ আমি বললাম : ‘খোদার কসম, আমি যদি কোনো দুনিয়াদারের সামনে হাযির হতাম তো অবশ্যই কোনো-না-কোন মনগড়া কথা বলে তাকে রাযী করিয়ে নিতাম। কিন্তু আপনার সম্পর্কে তো এই ঈমানই পোষণ করি যে, এখন যদি কোনো বানোয়াট কথা বলে আপনাকে রাযী করিয়ে নিই, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই আমার প্রতি আপনাকে নারাজ করে দেবেন। কাজেই সত্য কথা বললে আপনি যদি অসন্তুষ্টও হন, তবুও আশা করবো, আল্লাহ আমার ক্ষামা জন্যে কোনো-না-কোন উপায় বের করে দেবেনই। সত্য কথা এই যে, আপনার কাছে উত্থাপন করার মতো কোনো ওজরই আমার নেই। আমি অভিযানে যেতে পুরোপুরি সমর্থ ছিলাম।’

এরপর হযরত (স) বললেন : ‘এ লোকটি নিশ্চয়ই সত্য কথা বলেছে। আচ্ছা উঠে যাও এবং আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত করা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।’ আমি উঠে গিয়ে আপন গোত্রের লোকদের সঙ্গে বসলাম। অতঃপর আমার ন্যায় আরো দুই ব্যক্তি -মুরারা বিন রাবী এবং হিলাল বিন্‌ উমাইয়াও একইরূপে সত্য কথা বললো।

এরপর আমাদের সঙ্গে কারো কথাবার্তা না বলার জন্যে নবী করীম (স) নির্দেশ দিলেন। এর ফলে অপর দুই ব্যক্তি ঘরেই বসে রইলো। কিন্তু আমি বাইরে বের হতাম, জামা‘আতের সঙ্গে নামায পড়তাম, বাজারে চলাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না। আমার মনে হতো, দুনিয়াটা যেন একেবারে বদলে গেছে, আমি একজন নবাগত, এখানে আমার কেউ পরিচিত নয়। মসজিদে নামায পড়তে গেলে নবী করীম (স)-কে সালাম করতাম এবং জবাবের জন্যে তাঁর ওষ্ঠদ্বয় নড়ে কি-না, তা দেখবার জন্যে শুধু ইন্তেজার করতাম। হযরত (স) আমার প্রতি কিরূপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, নামাযের মধ্যে তা আড়চোখে দেখতাম। আম যতক্ষণ নামায পড়তাম, হযরত (স) আমার দিকে চেয়ে থাকতেন; যখনই সালাম ফিরাতাম, তখন আমার দিক থেকে তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিতেন।

একদিন আমি ভয়ে ভয়ে আমার চাচাত ভাই এবং বাল্যবন্ধু আবু কাতাদার কাছে গেলাম। তার বাগানের প্রাচীরের ওপর উঠে তাকে সালাম করলাম; কিন্তু আল্লাহর এই বান্দাহ সালামের জবাবটি পর্যন্ত দিলো না। আমি বললাম : আবু কাতদাহ’ আমি তোমায় খোদার কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আমি কি খোদ এবং তাঁর রসূলকে ভালবাসি না’? সে নিরুত্তর রইলো। আবার জিজ্ঞেস করলাম। এবারও সে নিরুত্তর রইলো। তৃতীয় বারে শুধু এটুকু বললো, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।’ এতে আমার চক্ষু দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে এলো। আমি প্রাচীর থেকে নেমে এলাম।

এ সময় একদিন আমি বাজারের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমনি সময় সিরিয়ার একটি লোক আমায় শাহ গাসবানের একটি খামে-পোরা চিঠি দিলো। আমি খুলে পড়লাম। তাতে লেখা ছিলো : আমরা শুনেছি, তোমাদের সাহেব তোমার ওপর ভীষণ উৎপীড়ন চালাচ্ছে। তুমি আমাদের কাছে এসো, আমরা তোমায় কদর করবো।’ আমি বললাম, এ আর এক বিপদ দেখছিকক! তক্ষুণি চিঠিখানি চুলায় নিক্ষেপ করলাম।

চল্লিশ দিন এমনিভাবে অতিক্রম করার পর নবী করীম (স)-এর আদেশ এলো, ‘আপন স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে যাও।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম তাকে কি তালাক দিয়ে দেবো? জবাব পেলাম, ‘না শুধু আলাদা থাকো।’ আমি আমার স্ত্রীকে তার পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দিলাম এবং বললাম, এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার কোন সিদ্ধান্ত আসা পর্যন্ত ইন্তেজার করো।

পঞ্চাশতম দিন সকালে নামাযের পর আমি আপন গৃহের ছাদের ওপর বসেছিলাম এবং নিজের জীবনকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম। এমনি সময় এক ব্যক্তি আমায় উপর্যুপরি ডেকে ডেকে বললো : ‘মুবারক হোক কা’ব বিন মালিক।’ আমি এ কথা শুনেই সিজদায় গেলাম। তারপর জানতে পারলাম, আমার জন্যে ক্ষমার হুকুম এসেছে। এরপর দলে দলে লোক ছুটে আসতে লাগলো এবং একজন অন্যজনের আগে এসে আমায় এই বলে মুবারকবাদ দিতে লাগলো যে, তোমার তওবা কবুল হয়েছ। আমি উঠে সোজা মসজিদে নববীর দিকে গেলাম। দেখলাম, নবী করীম (স)-এর মুখমন্ডল খুশীতে ঝলমল করছে। আমি সালাম করতেই তিনি বললেন, ‘তোমার মুবারক হোক, এই দিনটি তোমার জীবনের সবচেয়ে উত্তম দিন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ ক্ষমা কি হযরত (স)-এর তরফ থেকে, না খোদার তরফ থেকে? তিনি বললেন, ‘খোদার তরফ থেকে।’ সেই সঙ্গে কুরআনের এই তওবা সংক্রান্ত আয়াতটি তিনি পড়ে শুনালেন।

আমি বললাম : ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার তওবার মধ্যে আমার সমস্ত ধন-সম্পদ খোদার পথে সদকা করে দেয়ার কথাও শামিল রয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘কিছু রেখে দাও, এটা তোমার জন্যে উত্তম হবে।’ আমি তাঁর নির্দেশ মতো খায়বরের অংশটি রেখে বাকী সব সদকা করে দিলাম। অতঃপর আমি আল্লাহর কাছে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করলাম : যে সত্যের বদলে আল্লাহ আময় ক্ষমা করে দিলেন, তার ওপর সরার জীবন আমি অবিচল থাকবো। তাই আজ পর্যন্ত আমি জেনে-শুনে কোনো অসত্য কথা বলিনি। আর আশা করি, ভবিষ্যতেও আল্লাহ এর থেকে আমায় রক্ষা করবেন।

ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য

এই কাহিনী থেকে সাহাবায়ে কিরামের সমাজ-জীবনের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তার কতিপয় উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক মুমিনেরই সামনে রাখা উচিত। এ থেকে ইসলামী আন্দোলন স্বীয় অনুবর্তীদের ভেতর কিরূপ মেজাজ গড়ে তোলে, তা সহজে আন্দাজ করা যাবে।
প্রথম কথা এই যে, ইসলাম ও কুফরের মধ্যে যখন সংঘর্ষের প্রশ্ন দেখা দেয়, তখন মুমিনদের জন্যে অত্যন্ত কঠোর পরীক্ষার সময় এসে উপস্থিত হয়। এ সময় সামান্য মাত্র গাফলতির কারণেও সারা জীবনের পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যেতে পারে। কারণ এমনি সময়ে কোনো মুমিন যদি ইসলামের সহায়তা না করে, তাহলে তার এই ত্রুটির পেছনে কোনো বদ্‌-নিয়্যাত না থাকলেও এবং এ রকম ত্রুটি সারা জীবনে একবার মাত্র সংঘটিত হলেও এরূপ ত্রুটির কারণে তার সারা জীবনের পুণ্য ও ইবাদত বরবাদ হয়ে যাবার আশংকা দেখা দিতে পারে। বস্তুত মুমিনদের জন্যে কখনো ইসলামের বদলে কুফরের সহায়তা করা অথবা কোনো অন ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে উৎসাহব্যঞ্জক কর্মনীতি গ্রহণ করার আদৌ অবকাশ নেই। বিশেষত যখন অন-ইসলামী আন্দোলনের মুকাবিলায় কোনো ইসলামী আন্দোলন উপস্থিত থাকে, তখন মুমিনদের যোগ্য-প্রতিভা আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার পরিবর্তে অন্য কাজে নিয়োজিত হলে অবস্থাটা আরা গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয় কথা এই যে, ইসলামী আদর্শের পথে যখন কোনো কর্তব্য পালনের ডাক আসে, তখন মুমিনদের পক্ষে শৈথিল্য দেখানো মোটেই উচিত নয়। কারণ শৈথিল্য দেখাতে দেখাতেই কাজের সময় চলে যায়; অতঃপর এই ত্রুটির পেছনেকোনো বদ নিয়্যাত ছিলো না, এ ওজরেও কোনো ফলোদয় হয় না।

সাহাবায়ে কিরামের সমাজ-কাঠামোর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, মুনাফিকরা মনগড়া ওজর পেশ করছে এবং তারা মিথ্যা কথা বলছে, এটা সবারই জানা;তবু নবী করীম (স) শুধু তাদের মুখের কথা শুনেই তাদের সমস্ত অন্যায় মাফ করে দিলেন। কারণ, তারা কোনো পরীক্ষার সময় ঈমানের সত্যতা প্রমাণ করবে, এ আশা কখনো ছিলো না। পক্ষান্তরে এদের মুকাবিলায় ঈমান ও ইখলাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কতিপয় সাচ্চা মুমিনের চরিত্র লক্ষ্যণীয়। মনগড়া ওজর তুলে পালানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এরা কেউ মিথ্যা কথা বলা পছন্দ করলেন না; বরং সুস্পষ্ট ভাষায় নিজেদের ত্রুটি স্বীকার করে নিলেন। কিন্তু এই স্বীকারোক্তির কারণেই তাঁদরেকে রেহাই দেয়া হলো না, বরং তাদের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ব্যবহার করা হলো। এটা তাঁদের ঈমান ও ইখলাস সম্পর্কে কোনো সন্দেহ সৃষ্টির কারণে নয়; বরং এজন্যে যে, মুনাফিকদের উপযোগী কাজ তারা কেন করতে গেলেন?

পরন্ত এই অপরাধের জন্যে নেতা যে শাস্তি দিলেন এবং অনুবর্তী তা যেভাবে ভোগ করলেন, সর্বোপরি গোটা সমাজ যেভাবে নেতার অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ করলো, তার প্রতিটি দিকই অনুপম ও অতুলনীয়। নেতা খুব কঠোর শাস্তি দিলেন; কিন্তু ঘৃণা বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নয়, প্রগাঢ় ভালোবাসা নিয়ে। কোনো স্নেহশীল পিতা যেমন অপরাধী পুত্রকে সাজা দেন এবং পুত্র সংশোধিত হলে আবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরাও প্রত্যাশা করেন, এ শাস্তি ঠিক তেমনি। শাস্তির কঠোরতায় অনুবর্তী অত্যন্ত অস্থির। কিন্তু কি আশ্চর্য! প্রিয় নেতার আনুগত্যের বদলে তাঁর অন্তরে না কোনো বিদ্রোহের ভাব জাগলো, না তিনি কোনো অভিযোগ করলেন আর না তাঁর কৃতিত্বের কোনো প্রতিদান চাইলেন। তারপর গোটা সমাজের মধ্যে নেতার হুকুম পালন করার ভাবধারা কতো তীব্র, তাও লক্ষ্যণীয়। যখনই আদেশ হলো যে, অমুক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে, তখন মনে হলো যেনো গোটা সমাজে তাঁর কোনো পরিচিত লোকেরই অস্তিত্ব নেই। আবার যখন তাঁর ক্ষমার কথা ঘোষিত হলো, তখন সবার আগে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানানোর জন্যে সমাজের প্রতিটি লোকই অস্থির হয়ে উঠলো।

বস্তুত নবীর আনুগত্যের এই নমুনাই কুরআন তার অনুসারীদের মধ্যে সৃষ্টি করতে চায়। আর ইসলামী আন্দোলনের কর্মী-কর্মাধ্যক্ষ্য ও নেতার মধ্যে এমনি ভাবধারা থাকাই বাঞ্ছনীয়। সাহাবীদের মধ্যে এমনি ভাবধারা থাকার কারণেই যখন অপরাধী দেখলেন, তাঁর চেয়ে বড়ো বড়ো অপরাধীও নিছক মিথ্যা বলে বেঁচে যাচ্ছে এবং সত্য কথা বলার জন্যেই তাঁকে কঠোরভাবে পাকড়াও করা হচ্ছে, তখন তাঁর ভেতর এতোটুকু ক্ষোভ পর্যন্ত জাগলো না, কোনোরূপ অসন্তোষও প্রকাশ পেলো না; বরং শাস্তি পাবার পর দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তিনি তা কঠোরভাবে ভোগ করলেন না; বরং শাস্তি পাবার পর দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তিনি তা কঠোরভাবে ভোগ করলেন। তাঁর সঙ্গে যে নির্মমতা করা হয়েছে, এরূপ ধারণাও তাঁর মনে এক মুহূর্তের তরেও ঠাঁই পেলো না। তাঁর অতীতের সমস্ত কৃতিত্ব ম্লান হয়ে গেলো; তাঁর ঈমান ও ইখলাস সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হলো। অথচ তাঁর বদ-নিয়্যাত ছিলো না, তাঁর হৃদয়ও আল্লাহ এবং রাসূলের ভালবাসা থেকে শূন্য ছিলো না। পরন্ত তিনি ইসলামী সমাজ-সংগঠনের মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র পাকালেন না, লোকদেরকে বীতশ্রদ্ধ করে তুললেন না, অন্যান্য লোকদেররেকও নিজের সমর্থ বানিয়ে সমাজ-সংগঠনের মধ্যে উপদল সৃষ্টির চেষ্টা করলেন না; বরং নিতান্ত ধৈর্য ও প্রশান্তির সঙ্গে তিনি শাস্তি ভোগ করলেন এবং কবে তাঁর অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হবে, প্রতিটি মুহুর্তে সেই আশায় অতিবাহিত করলেন। এহেন আদর্শ কর্মনীতির ফলেই আল্লাহ তাআলা নিতান্ত দরদ পূর্ণ ভাষায় শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমার কথা ঘোষণা করলেন। বস্তুত মুসলিম হিসেবে এই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। আর আল্লাহ যাকে দান করেন, কেবল সে-ই এতোবড়ো অনুগ্রহ লাভ করতে পারে।

একজন লোকের ওপর ঈমান ও ইসলামের দাবি কতো খানি দায়িত্ব অর্পণ করে, এ সময় তাও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হলো। বলা হলো : প্রকৃত পক্ষে এ দাবির পর মুমিনদের নিজস্ব বলতে আর কিছুই থাকে না; কারণ পবিত্র কুরআনের শিক্ষানুযায়ী ‘আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জান ও মাল খারদ করে নিয়েছেন।’ (সূরা তাওবা : ১১)।

বস্তুত ঈমানের এই ব্যাখ্যা যতক্ষণ লোকের মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল না হবে এবং প্রতি মুহূর্ত তা সামনে না থাকবে, ততক্ষণ দ্বীনের দাবি পূরণে সে অবশ্যই শৈথিল্য দেখাবে। আল্লাহ তা‘আলা ঈমানকে মুমিন ও আল্লাহর মধ্যকার একটা চুক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। এ চুক্তি হচ্ছে এই যে, বান্দাহ তার আপন সত্তা ও ধন-মালকে যেনো আল্লাহর কাছে বেচে দিলো এবং তার বিনিময়ে আল্লাহ মৃত্যুর পরবর্তী অনন্ত জীবনে তাকে জান্নাত দান করবেন-এই প্রতিশ্রুতিকে গ্রহণ করলো।

সত্য কথা বলতে গেলে মানুষের জান, মাল সব কিছু আল্লাহরই সম্পদ। তিনিই এসব জিনিস সৃষ্টি করেছেন আর তিনিই এর প্রকৃত মালিক। এমতাবস্থায় বান্দাহ আল্লাহর কাছে বেঁচতে পারে তার এমন নিজস্ব কোন জিনিসট রয়েছে? এভাবে বেচা-কেনার তো প্রশ্নই উঠতে পারে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহ মানুষকে একটা স্বাধীন কর্মক্ষমতা দান করেছেন এবং তাকে আপন ইচ্ছানুযায়ী কাজে লাগাবার ইখতিয়ারও দিয়েছেন। ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতার এই স্বাধীনতাবলে মানুষ আল্লাহর দেয়া জান ও মালকে ইচ্ছা করলে আল্লাহরই সম্পত্তি বলে মানতে পারে- প্রকৃতপক্ষে যেরূপ হওয়া উচিত- আবার ইচ্ছা করলে সে নিজেকেই ঐ জিনিসগুলোর মালিক বলে দাবি করতে পারে- যদিও সে ঐগুলোর মালিক নয়। এই উভয় প্রকার স্বাধীনতাই তাকে দান করা হয়েছে। মানুষ ইচ্ছা করলে খোদার প্রতি বিমুখ হয়ে তার জান ও মালকে নিজের ইচ্ছা-প্রবৃত্তি কিংবা তারই মতো অন্য মানুষের ইচ্ছা-প্রবৃত্তি অনুযায়ী যদৃচ্ছ ব্যবহার করতে পারে অথবা ইচ্চা করলে প্রকৃত মালিককে মেনে নিয়ে তাঁর দেয়া জান-মালকে তাঁরই মর্জী মাফিক কাজে লাগাতে পারে এবং এভাবে তার কাছে গচ্ছিত জিনিসগুলো যে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আমানত এবং এগুলোর ব্যবহারে সে স্বাধীন কিংবা অবাধ ক্ষামতার অধিকারী নয়ত এ সত্যকে সে স্বীকৃতি দিতে পারে। এই উভয়বিধ ক্ষমতাই তাকে দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা যে বিষয়টিকে অনুগ্রহবশত বেচা-কেনা বলে আখ্যা দিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতার এই সামান্য স্বাধীনতাই হচ্ছে তার মূল ভিত্তি। আল্লাহ তা’আলা বান্দাহকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, ইচ্ছা ও ইখতিয়ারের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তুমি আমার গচ্ছিত আমানতকে যদি খেয়ানতের কাজে না লাগাও বরং আমারই মর্জি মাফিক তা কাজে ব্যববহার করো, তাহলে এই স্বল্পায়ু জীবনের পরবর্তী অনন্ত জীবনে আমি তোমায় বেহেশতের সুখ-সম্পদে সম্মানিত করবো। সুতরাং যে ব্যক্তি এক্ষণে আল্লাহ তা’আলার এই দাবি ও প্রতিশ্রুতিকে মেনে নিয়ে নিজের জান ও মালকে তারই পছন্দনীয় কাজে ব্যবহার করার স্বীকৃতি দেয়, সে-ই হচ্ছে ঈমানদার এবং তার এ স্বীকৃতিকেই আল্লাহ তা’আলা বেচা-কেনা বলে অভিহিত করেছেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এ দাবি ও প্রতিশ্রুতিকে অগ্রাহ্য করে নিজের জান- আল্লাহর মর্জির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সঙ্গে এই বেচা-কেনার কারবার করতেই অস্বীকৃতি জানায়। তাই আল্লাহর দৃষ্টিতে সে হচ্ছে কাফির এবং তার এই অস্বীকৃতিই হচ্ছে কুফর।

তাবুক যুদ্ধের সময় নবী করীম (স) যে সব লোককে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা সবাই ছিলো ঈমামানের দাবিদার। এরা সকলেই আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে উপরোল্লিখিত বেচা-কেনার চুক্তি করেছিলো। কিন্তু যখন তাদের দাবি প্রমাণে সময় এলো তখন তাদের কিছু লোক পরীক্ষায় সমম্পূর্ণ উত্তীর্ণ হতে পারলো না। তারা আপন জান ও মালকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করা থেকে বিরত রইলো। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলো মুনাফিক। তাদের ঈমানেনর দাবি ছিলো মিথ্যা। তারা শুধু অক্ষমতা বা চাপের ফলেই ইসলামী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছিলো। কিন্তু তাদের সঙ্গে কতিপয় দুবর্বলচেতা লোকও ছিলেন, যাঁরা শুধু গাফলতি ও শৈথিল্যর দরুণ ও এ ভুলটা করেছেন। তাই এ সময় তাঁদের খোলাখুলি সমালোচান করার পর এ কথাও সুস্পষ্টভাপবে জানিয়ে দেয়া হলো যেন কেবল খোদার অস্তিত্ব মেনে নেয়াকেই ঈমান বলা যায় না; বরং খোদাকেই আমাদের জান-মালের একমাত্র মালিক বলে স্বীকৃতি দেয়াই হচেছ প্রকৃত ঈমান। এভাবে আল্লাহ তা’আলাকে চূড়ান্ত মালিক মেনে নেবার পর কেউ যদি স্বীয় জন ও মালকে আল্লাহর পথে নিয়োজিত করতে কুণ্ঠিত হয় এবং তাকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করে, তাহলে কার্যত তার স্বীকৃতিটা মিথ্যা বলেই প্রমাণিত হবে। তাই ঈমানের প্রত্যেক দাবিদারেরই তার দাবির এই তাৎপর্য হামেশা স্মরণ করা উচিত এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার কোনো সুযোগ গ্রহণেই তার কুণ্ঠিত হওয়া অনুচিত।

জনসাধারণের দ্বীনী প্রশিক্ষণ

ইসলামের সূচনাকালে যে সব লোকের হৃদয়ে ইসলামের সত্যতা আসন পেতে নিতো এবং যারা পুরোপুরি বুঝে-শুনে ইসলাম গ্রহণ করতো, কেবল তারাই এ আন্দোলনের সহায়তা করতে এগিয়ে আসতো। কিন্তু এ পর্যায়ে ইসলামের প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় দলে দলে লোকেরা ইসলামের মধ্যে দাখিল হতে লাগলো। দেশের পর দেশ, জনপদের পর জনপদ ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। এর ফলে খুব কম লোকই পুরোপরি বুঝে-শুনে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পেলো; বরং বেশির ভাগ লোকই অল্প কিছু জেনে-শুনে ইসলামের সহায়তা করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। এভাবে হাজার হাজার লোক ইসলামী সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগলো। দৃশ্যত এই পরিস্থিতিটা ছিলো ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত কোনো জনসমষ্টি ইসলামের দাবিগুলো কে উত্তমরূপে বুঝতে না পারবে এবং এবং ইসলাম কর্তৃক অর্পিত নৈতিক দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত না হবে, ততোক্ষণ সে ইসলামী সমাজের পক্ষে দুর্বলতারই কারণ হয়ে থাকবে। তাবুক অভিযানকালে এমনি পরিস্থিতিরই কিছুটা আভাস পাওয়া গিয়েছিলো। তাই এই সুযোগে ইসলামী আন্দোলকে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকে পরিত্রাণ পাবার উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ প্রদান করা হলো। তাহলো এই যে, জনসাধারণের মধ্য থেকে কিছু লোককে ইসলামের কেন্দ্রসমূহ (যেমন মক্কা, মদীনা ইত্যাদি) আসতে হবে এবং এসব কেন্দ্র থেকে ইসলামের শিক্ষা -দীক্ষা ও তার বিস্তারিত নিয়ম-কানুন শিখে তাদেরকে সত্যিকার ইসলামী ভাবধারা আত্নস্ত করতে হবে। অতঃপর মুসলিম জন-মানসে সঠিক ইসলামী চেতনা জাগ্রত করার ও তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশাবলী সম্পর্কে অবহিত করানোর উদ্দেশ্যে এই শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকদেরকে আপন আপন জনপদে ফিরে গিয়ে জনগণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

এই সাধারণ ইসলামী শিক্ষার অর্থ কেবল লোকদেরকে কিছু লেখা-পড়া শেখানোই ছিলো না; বরং লোকদের মধ্যে দ্বীনী চেতনা সৃষ্টি এবং ইসলামী ও অন ইলামী জীবন পদ্ধতির পার্থক্যবোধ জাগিয়ে তোলাই ছিলো এর উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে কোনো গৎবাঁধা প্রক্রিয়া ছিলো না। এটা লেখাপড়া শিখিয়েই হোক আর না শিখিয়েই হোক, কোনো প্রকারে হাসিল করতে পারলেই হলো। কেননা, মুখ্য উদ্দেশ্য হলো দ্বীন সম্পর্কে সঠিক চেতনা সৃষ্টি করা। এজন্যে লেখাপড়া একটা মাধ্যম হতে পারে, উদ্দেশ্য নয়।
দারুল ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা

ইসলামী আন্দোলন একদিন না একদিন প্রচণ্ড রকমের একটা আঘাত খেয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে বলে মুনাফিকরা এদ্দিন মনে মনে আশা পোষণ করে আসছিলো। কিন্তু তাবুক অভিযানের পর তাদের সব আশা-ভরসাই ধুলিসাৎ হয়ে গেলো। এক্ষণে এই শ্রেণীর লোকদের সামনে ইসলামের চৌহদ্দীতে আশ্রয় গ্রহণ করা কিংবা তারা নিজেরা ইসলাম গ্রহণ না করলেও তাদের ভবিষ্যত বংশধরদের ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর রইলো না।

এ সময় সমগ্র আরব ভুমির শাসন ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে নিবদ্ধ ছিলো। তাদের মুকাবিলা করার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি বর্তমান ছিলো না। তাই এবার ইসলামী হুকুমতের অভ্যন্তরীণ নীতি ঘোষণার সময় এলো। নিম্নোক্ত পন্থায় সেই নীতি ঘোষণা করা হলো :

ক. আরব উপদ্বীপ থেকে শিরককে সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। পুরানো মুশরিকানা ব্যবস্থাকে খতম করে আরব ভূমিকে চিরকালের জন্যে ইসলামের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে মুশরিকদের স সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে যতো চুক্তি রয়েছে, তা সব বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
এই নীতি অনুসারে নবম হিজরীর হজ্জ উপলক্ষে নবী করীম (স) হযরত আলী (সা)-এর মারফত হাজীদের সাধারণ সমাবেশে ঘোষণা করেন :

১. যে ব্যক্তি দ্বীন-ইসলম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
২. এ বছরের পর কোনো মুশরিক কা’বা গৃহে হজ্জ করতে আসতে পারবে না।
৩. কাউকে নগ্ন হয়ে বায়তুল্লাহর চারদিকে তওয়াফ করার অনুমতি দেয়া হবে না।

৪. যাদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চুক্তি রয়েছে এবং যারা চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি, তাদের সঙ্গে চুক্তির শর্তানুযায়ীই ব্যবহার করা হবে এবং তার মেয়াদ পূর্ণ করা হবে। কিন্তু যারা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বেছে, তাদের জন্যে আর মাত্র চার মাসের অবকাশ রয়েছে। এই অবকাশের ভেতর হয় মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হবে, নচেত দেশ ছেড়ে তাদেরকে চলে যেতে হবে অথবা বুঝে-শুনে আল্লাহর দ্বীনকে গ্রহণ করে ইসলামী ব্যবস্থাপনায় শামিল হতে হবে।
খ. কা’বার তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা সম্পূর্ণত তওহীদ বাদীদের হাতে থাকবে। এতে মুশরিকদের কোনো অধিকার থাকবে না। এবার থেকে কা’বার ভেতর কোনো মুশরিকানা প্রথা পালন করা যাবে না; এমন কি কোনো মুকশরিক এই পবিত্র ঘরের নিকটে পর্যন্ত আসতে পারবে না।

0 comments:

Comment Please

মন্তব্য..

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম